মুখ ও শরীরে অন্যান্য অংশ থেকে নিমেষের মধ্যে সান ট্যান কি ভাবে দূর করা যায়?
ট্যানিং এমন একটি ত্বকের সমস্যা যা প্রায় সবারই হয় এবং সবাই ভাবেন এটি দূর করা অসম্ভব, বিশেষতঃ আপনি যদি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে থাকেন। কিন্তু এটা সত্যি না। ট্যান হয়ে যাওয়া ত্বক সহজেই ঠিক করার বেশ কিছু পদ্ধতি আছে। ট্যান দূর করার নিরাপদ ও কার্যকরী উপায় জানতে আর্টিকলটি পড়ুন।
ত্বকে কালো দাগ হওয়া/ ট্যানিং (Tanning) কি?
আমাদের ত্বকে মেলানিন (melanin) নামের পিগমেন্টটির (pigment) সূর্যের আলোর প্রভাবে বেড়ে যাওয়াকেই ট্যানিং বলে। ট্যানিং বেডে (bed) লাগানো ট্যানিং ল্যাম্পের (lamp) সাহায্যে কৃত্রিম ট্যানিং করাও সম্ভব, তবে প্রাকৃতিক সূর্যালোক ত্বকে কালো দাগ হওয়া/ ট্যানিংয়ের (tanning) প্রধান কারণ। দেহের যে অংশে বেশি সূর্যের আলো লাগে, সেগুলির ত্বক কালো হয়ে যায় অর্থাৎ মুখ, বাহু, হাত, পা, পিঠ, ঘাড়।
ট্যানিং কি ভাবে হয়?
সূর্যরশ্মির মধ্যে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আছে, তাদের মধ্যে ত্বকের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি (ultraviolet radiation)। ইউভি রশ্মির তিনটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য হয় – ইউভি এ, ইউভি বি ও ইউভি সি। ইউভি বি রশ্মি ত্বক পুড়িয়ে দেয় এবং ইউভি এ রশ্মি ত্বকের রং কালো করে দেয় ও ত্বকে আলোকজনিত বয়সের ছাপ ফেলে (photo ageing)। ইউভিএ রশ্মি যখন ত্বকের স্তর ভেদ করে ঢোকে, তারা মেলানোসাইট (melanocyte) কোষগুলিকে উত্তেজিত করে অতিরিক্ত মেলানিন তৈরি করায় এবং এই মেলানিন অক্সিডাইজ (oxidise) হয়ে আরও কালো রং হয়ে যায় – এর ফলে ট্যানিং দেখা দেয়। এই রশ্মি কোলাজেনেরও (collagen) ক্ষতি করতে পারে।
আপনার ট্যানড ত্বকের চিকিৎসা করার প্রয়োজন কি?
ট্যানড ত্বক থেকে আরও ক্ষতি হতে পারে যেমন বয়সের ছাপ তাড়াতাড়ি পড়া, ত্বকের ক্যানসার (cancer), ইমিউনিটি (immunity) কমে যাওয়া ইত্যাদি। তাই এর চিকিৎসা করা উচিত।
সান ট্যান কিভাবে দূর করা সম্ভব?
অনেকেই বিশ্বাস করে একবার সান ট্যান হলে তা দূর করা অসম্ভব। কিন্তু এটা একদমই সত্যি না। সান ট্যানড ত্বকের জন্য কি করা উচিত জানতে আগে পড়ুন। সান ট্যানের কালো দাগ কমাতে বিভিন্ন প্রোডাক্ট (product), ওষুধ ও চিকিৎসাপদ্ধতি আছে। ট্যান দূর করার সমস্ত পদ্ধতিতেই ত্বকের উপরের মৃত কোষের স্তর এবং তার সাথে জমা অতিরিক্ত মেলানিনকে অপসারণ করা হয়। এর ফলে ত্বকে রঙের সামঞ্জস্য আসে ও বয়সের ছাপও কমে যায়।
আপনার মুখ, ঘাড়, হাত, পা ও বাহুমূল থেকে ট্যান সরানোর জন্য কিছু কার্যকরী চিকিৎসার কথা নিচে বলা হল:
সান ট্যান দূর করার চিকিৎসা:
১ – লেজার টোনিং (Laser Toning)
চর্মবিশেষজ্ঞর কাছে করানো লেজার ট্যান রিমুভাল (laser tan removal) একটি খুবই কার্যকরী চিকিৎসা। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে কিউ সুইচড য়াগ লেজার (Q switched YAG Laser) সহ একটি লেজার যন্ত্র দিয়ে পিগমেন্টগুলিকে ভেঙে দিয়ে ট্যান ও সূর্যের আলোর ছোপ কমানো হয়।
অলিভা স্কিন এবং হেয়ার ক্লিনিকের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডার্মাটোলজিস্ট, ডাঃ রাওয়ালী ইয়ালামাচিলির সাথে ট্যান দূর করার চিকিৎসার ব্যাপারে দেখুন:
২ – কেমিক্যাল পিল (Chemical Peel):
কেমিক্যাল পিল দিয়েও সান ট্যানড ত্বকের চিকিৎসা হয়, ত্বকের ট্যানড স্তরটি সরিয়ে তাকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করা যায়। বিভিন্ন কনসেনট্রেশনের (concentration) পিল দিয়ে ত্বকের উপরের মৃত কোষের স্তর ও অতিরিক্ত মেলানিন তুলে দিয়ে ত্বকের কালো ভাব দূর করা যায়।
৩ – মাইক্রোডার্মাব্রেশন (Microdermabrasion):
এতেও ত্বকের উপরের মৃত কোষ ও ট্যানড স্তরটি তুলে ফেলা হয়।
ট্যান দূর করার অন্যান্য বিকল্প পদ্ধতি
উপরে লেখা চিকিৎসাগুলির কিছু বিকল্প পদ্ধতি হল:
১ – ট্যান দূর করার ক্রীম (Cream):
বাজারে বিভিন্ন সান ট্যান দূর করার ক্রীম ও ব্লিচ কিনতে পাওয়া যায়। সমস্যা হলো এগুলি সবই ক্ষণস্থায়ী সমাধান। ট্যানিং ত্বকের উপরের এবং গভীর স্তরে প্রভাব ফেলে। এই ক্রীমগুলি ত্বকের উপরিভাগের চিকিৎসা করতে পারলেও ভিতর অবধি পৌঁছতে পারেনা তাই গভীর স্তরের চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে চর্মবিশেষজ্ঞর পরামর্শ নিয়ে সবচেয়ে ভাল ক্রীম কিনবেন।
২- ফেসপ্যাক, ওয়াক্স ও ফেসওয়াশ (Face Pack, Wax and Facewash):
ত্বকের ট্যান দূর করার জন্য বেশ কিছু ফেসপ্যাক ও ফেসওয়াশ কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু ক্রীমের মত এদের ফলও দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং এরা গভীর অবধি পরিষ্কার করে বলে দাবি জানালেও সাধারণতঃ তা করতে পারেনা। ফেসপ্যাক, ওয়াক্স বা ফেসওয়াশ ব্যবহার করারও প্রধান সমস্যা হচ্ছে এরা শুধু ত্বকের উপরটুকুই পরিষ্কার করতে পারে। সান ট্যানের গভীরে পৌঁছনো এদের সাধ্য নয়।
৩ – ঘরোয়া টোটকা :
অনেক ঘরোয়া টোটকাও আজকাল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এগুলিতে প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, কিন্তু এরা দীর্ঘস্থায়ী লাভ দিতে পারে বলে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই বিকল্প পদ্ধতিগুলির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে যেমন জ্বালা, চুলকানি বা অ্যালার্জি। ত্বক কিছুদিনের জন্য উজ্জ্বল হলেও আগের কালো দাগ সম্পূর্ণ বা বিক্ষিপ্ত ভাবে ফিরে আসতে পারে। এতে চিকিৎসা করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতে ট্যান দূর করার চিকিৎসার খরচ
১ – আধুনিক ত্বকে কালো দাগ/সান ট্যান অপসারণ চিকিৎসার (sun tan removal treatment) খরচ ভারতে ৪,০০০ টাকা – ১০,০০০ টাকার মত পড়ে। কত বড় জায়গা জুড়ে ট্যান হয়েছে, ট্যান কতটা গভীর, ক্লিনিকটি কোথায় অবস্থিত এবং কতটা নামকরা, ডাক্তারের কতখানি অভিজ্ঞতা, কি চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে – এর উপর নির্ভর করে খরচ কমবেশি হতে পারে।
২ – নামকরা পার্লারে বিভিন্ন ফেসপ্যাক দিয়ে ডি-ট্যান (de-tan) চিকিৎসা করা হয়, তার দাম পড়ে ১,০০০ – ২,৫০০ টাকার মত (মুখের জন্য) বা ৭০০ -১,৫০০ টাকার মত (বগল বা পায়ের জন্য)।
৩ – ব্র্যান্ড এবং উপাদানের উপর নির্ভর করে, দোকানে পাওয়া ক্রীম বা লোশনের দাম সাধারণতঃ ১০০ – ২,০০০ টাকার মধ্যে পড়ে।
বিঃ দ্রঃ এই মূল্যগুলি প্রতীকী এবং শহর অনুযায়ী বদলাতে পারে। আমরা দিল্লি, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, পুনে, কলকাতা, কোচি ও ভাইজ্যাগ – এই শহরগুলির গড়পড়তা হিসাবে এই মূল্যগুলির উল্লেখ করেছি।
আগে ও পরের ফলাফল কেমন হয়?
সান ট্যান দূর করার চিকিৎসায় কত সময় লাগবে?
সান ট্যান দূর করার চিকিৎসায় কত সময় লাগবে তা নির্ভর করে কি পদ্ধতিতে চিকিৎসা হয় এবং কোন জায়গার কতখানি জুড়ে চিকিৎসা হয় তার উপর।
১ – কেমিক্যাল পিল –
কেমিক্যাল পিলের ১ – ২টি সেশনের পর ট্যানড স্কিনে স্পষ্ট তফাৎ দেখতে পাওয়া যায়। চর্মবিশেষজ্ঞরা সাধারণতঃ মুখের ট্যানের জন্য কেমিক্যাল পিল করেন এবং পুরো ফল পেতে ৪-৬টি সেশনের পরামর্শ দেন।
২ – লেজার টোনিং –
লেজার টোনিং চিকিৎসার পরেই ট্যান বেশ কিছুটা কমে যায়। দেহের কোন জায়গায় আছে তার উপর নির্ভর করে আপনার ৪ – ৬টি সেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
৩ – মাইক্রোডার্মাব্রেশন –
মাইক্রোডার্মাব্রেশন চিকিৎসার ভাল ফল পেতে ৪ – ৬টি সেশন লাগতে পারে।
সূর্যের সংস্পর্শে ত্বকে কালো দাগ হওয়া / সান ট্যানিং এড়ানো যায় কিভাবে?
সান ট্যানিং এড়াতে আপনি নিম্নলিখিত জিনিসগুলি করতে পারেন:
- এসপিএফ (SPF) ৩০-এরউপরেকোনসানস্ক্রিনলোশন৩ঘন্টাঅন্তরলাগাতেথাকুন।বাইরেবেরোনোর২০-৩০মিনিটআগেলাগাবেন।
- প্রখররোদেরসময়বাইরেবেরোনোএড়িয়েচলুন।
- ত্বককেট্যানথেকেরক্ষাকরতেজামাকাপড়দিয়েঢেকেরাখুন।
- চওড়া-কানাওয়ালা (broad-rimmed) টুপি, রোদচশমা, ওড়নাইত্যাদিদিয়েনিজেকেরোদথেকেবাঁচিয়েরাখুন।
লেজার টোনিং, কেমিক্যাল পিল জাতীয় প্রক্রিয়া ট্যান দূর করার সাথে সাথে ত্বককে উজ্জীবিত, চকচকে ও মসৃণ করে তোলে।
এখন গ্রীষ্ম এসে গেছে, অতএব এই তীব্র রোদ যাতে আপনার ত্বকের ক্ষতি না করে তার খেয়াল রাখুন! ট্যানড ত্বককে সজীব করে তুলতে চটপট চর্মবিশেষজ্ঞর সঙ্গে পরামর্শ করুন!